তিনি ছবিটা দেখে বললেন, এটা তো জোনাকির ঝাঁক। জোনাকির ইংরেজি ফায়ারফ্লাই।


 একটা ছবি কল্পনা করুন। হাজার হাজার গ্যালাক্সির ভিড়ে এক কোণে জোনাকির মতো মিটমিট করছে ১০টি আলোর ফোঁটা। নাসার সবচেয়ে দামি টেলিস্কোপও এতদিন সেটা আলাদা করে দেখতে পারেনি। প্রথমবারের মতো সেটা দেখলেন একজন বাংলাদেশি।


তিনি ছবিটা দেখে বললেন, এটা তো জোনাকির ঝাঁক। জোনাকির ইংরেজি ফায়ারফ্লাই। আর জোনাকির ঝাঁককে ইংরেজিতে বলে স্পার্কল। তাই তিনি ওই নবজাতক গ্যালাক্সির নাম দিলেন ‘ফায়ারফ্লাই স্পার্কল’।


এই গল্পটা ড. লামিয়া মওলার।


লামিয়া আশরাফ মওলা। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একজন অ্যাস্ট্রোনমার। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ওয়েলেসলি কলেজের অ্যাস্ট্রোনমির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। ওয়েলেসলির নিজস্ব ওয়েবসাইট বলছে, তিনি একজন অবজারভেশনাল অ্যাস্ট্রোনমার, যিনি হাবল ও জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এবং কসমোলজিক্যাল সিমুলেশন ব্যবহার করে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের গ্যালাক্সির জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিয়ে কাজ করেন।


শিক্ষাজীবনটাও রূপকথার মতো। ওয়েলেসলি কলেজ থেকেই বিএ, তারপর ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি। পড়ান কসমোলজি, গ্যালাক্সি, অবজারভেশনাল অ্যাস্ট্রোনমি। আর তার একটা অন্যরকম আগ্রহ আছে — নন-ওয়েস্টার্ন সায়েন্সের ইতিহাস আর শিল্পের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে মেলানো। বিজ্ঞানকে তিনি শুধু সমীকরণে আটকে রাখতে চান না।


বিশ্বজুড়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর। সেদিন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয় তার নেতৃত্বে করা একটি গবেষণা।


গবেষণার বিষয় ছিল ফায়ারফ্লাই স্পার্কল।


নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ প্রথমবারের মতো এমন একটি গ্যালাক্সিকে শুধু দেখেইনি, ‘ওজন’ও মেপেছে, যা তৈরি হয়েছিল বিগ ব্যাংয়ের মাত্র ৬০ কোটি বছর পর, যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল এখনকার ৫ শতাংশেরও কম। এই গ্যালাক্সির ভর ছিল ঠিক ততটাই, যতটা আমাদের মিল্কিওয়ের ভর ছিল সেই একই বয়সে। এর আগে ওয়েব যত গ্যালাক্সি দেখেছে, তারা সবাই ছিল অনেক বেশি ভারী।


এই গ্যালাক্সিটি জ্বলজ্বল করছিল ১০টি আলাদা তারা-গুচ্ছ নিয়ে। লামিয়া নিজেই ওয়েবের ছবিতে প্রথম এই গুচ্ছগুলোকে আলাদা করেন। তিনি পরে বলেছিলেন, এত কম বয়সী একটি গ্যালাক্সিকে এতগুলো আলাদা অংশে ভাগ করা যাবে, এটা তিনি ভাবেনইনি।


এটা সম্ভব হয়েছিল দুটি কারণে। এক, সামনে থাকা বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার MACS J1423.8+2404-এর মহাকর্ষীয় লেন্সিং, যা দূরের আলোকে ২৬ গুণ বড় করে দেখায়। আর দুই, জেমস ওয়েবের ইনফ্রারেড চোখ। এই দুইয়ে মিলে আমরা দেখতে পেলাম আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সির শৈশব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ফায়ারফ্লাই স্পার্কলের আলো আমাদের কাছে আসতে সময় নিয়েছে ১৩.২ বিলিয়ন বছর।


এই আবিষ্কারের সঙ্গে আরও দুটি ছোট গ্যালাক্সি আছে, যাদের আদর করে নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফায়ারফ্লাই-বেস্ট ফ্রেন্ড’ আর ‘ফায়ারফ্লাই-নিউ বেস্ট ফ্রেন্ড’। তারা ফায়ারফ্লাই স্পার্কল থেকে মাত্র ৬,৫০০ এবং ৪২,০০০ আলোকবর্ষ দূরে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই তিনজন একে অন্যকে প্রদক্ষিণ করতে করতে একদিন মিলে যাবে, যেভাবে মিল্কিওয়ে তৈরি হয়েছে।


কিন্তু লামিয়ার গল্পটা শুধু নাসা বা নেচারে আটকে নেই।


২০২২ সালে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডানল্যাপ ইনস্টিটিউট থেকে একটি আউটরিচ গ্রান্টের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন দুটি অত্যাধুনিক ইউনিস্টেলার টেলিস্কোপ। সেই টেলিস্কোপ দুটি এখন আছে আইইউবিতে।


আর ২০২৩ সালের ৯ মার্চ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দূরবীন’। বাংলায় টেলিস্কোপকে বলে দূরবীন — যা দূরের জিনিসকে কাছে দেখায়। দূরবীন হলো ক্যাসার একটি আউটরিচ প্রোগ্রাম, যার মূলমন্ত্র — ভাষা, দেশ, ধর্ম, লিঙ্গ, শ্রেণির সীমানা পেরিয়ে মহাকাশের বিস্ময়কে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই প্রোগ্রামের ভলান্টিয়াররা সারা দেশে স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশুদের চাঁদ, গ্রহ, গ্যালাক্সি দেখায়। ২০২৬ সালের মে থেকে এই উদ্যোগটি ব্রিটিশ কাউন্সিলের উইমেন অফ দ্য ওয়ার্ল্ড গ্রান্টে চলছে।


আর এখন তিনি জড়িয়ে আছেন মানবজাতির পরবর্তী বড় চোখের সঙ্গেও। নাসার ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ, যা গত ৩০ আগস্ট ২০২৬-এ সফলভাবে উৎক্ষেপণ হয়েছে, তার ভবিষ্যৎ গবেষণা দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভূমিকায় আছেন লামিয়া। রোমান যে হাজার হাজার কোটি গ্যালাক্সির মানচিত্র আঁকবে, সেখানে প্রথম দিকের গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তার উত্তর খুঁজবেন তিনি।


ওয়েলেসলির ক্লাসরুমে বসে তিনি যখন বলেন, ‘Nothing is ours, we just have the privilege to work on this’, তখন বোঝা যায়, বিজ্ঞানকে তিনি অহংকার নয়, বিনয় হিসেবে দেখেন।


ঢাকার কোনো ছাদে আজও যদি কোনো মেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে — আমি কি পারব? তার জন্য উত্তর হয়ে আছেন লামিয়া মওলা।


তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ থেকে মহাকাশ অনেক দূরে নয়। মাত্র একটা দূরবীনের দূরত্ব।


Disclaimer: এই ফিচারটি ওয়েলেসলি কলেজ, নাসা, নেচার জার্নাল (১১ ডিসেম্বর ২০২৪), আইইউবি ক্যাসা এবং দূরবীন-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা। 

Post a Comment

Previous Post Next Post