প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের ১৭ রাকাতে আমরা অন্তত ১৭ বার সূরা আল-ফাতিহা তিলাওয়াত করি। মহান আল্লাহর প্রশংসা করি, তাঁর অসীম রহমতের আশা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই এবং সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার প্রার্থনা জানাই। কিন্তু প্রতিদিনের এই প্রার্থনা ও অঙ্গীকার আমাদের চিন্তা, আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং জীবনযাপনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? সফলতার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা কি কখনো জীবনের আসল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি? বাংলাদেশের লেখক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. ফেরদৌস সালেহীন সূরা আল-ফাতিহার সাতটি আয়াতের আলোকে এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছেন, যা আমাদের নিজেদের জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে উৎসাহিত করে।
:
মানুষ আজ এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার মধ্যে বসবাস করছে। ভালো চাকরি, বেশি অর্থ, বড় বাড়ি, সামাজিক মর্যাদা এবং সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষায় আমাদের ছুটে চলা যেন থামতেই চায় না। একটি স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়ায় আরেকটি স্বপ্ন। আমরা অর্জনের পর অর্জন করে চলি, কিন্তু কোথায় গিয়ে থামব, কোন অর্জনে সত্যিকারের তৃপ্তি মিলবে, আর কত দূর এগোলে নিজেদের সফল বলতে পারব, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক সময় অজানাই থেকে যায়।
এই অবিরাম দৌড়ের মাঝেই জীবনে জমতে থাকে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক চাপ। কেউ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে না পেরে কষ্ট পান, আবার কেউ জীবনে অনেক কিছু অর্জন করার পরও মনের শান্তি খুঁজে পান না। কেউ অতীতের অপমান ও ব্যর্থতার স্মৃতি বয়ে বেড়ান, কেউ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। অথচ এসব ব্যস্ততার মধ্যে আমরা খুব কমই থেমে নিজেদের প্রশ্ন করি, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? সফলতা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? পৃথিবীতে আমাদের পথচলা কি কেবল অর্থ, প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য?
এই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে ড. ফেরদৌস সালেহীন ফিরে তাকিয়েছেন মুসলমানদের বহুল পরিচিত একটি সূরার দিকে, যা প্রতিদিনের নামাজে বারবার পাঠ করা হয়। সূরা আল-ফাতিহার সাতটি আয়াতের মধ্যে তিনি খুঁজেছেন মানুষের বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা, প্রার্থনা, দায়িত্ববোধ এবং জীবন পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত গভীর তাৎপর্য। তাঁর উপলব্ধি, যে কথাগুলো আমরা প্রতিদিন মহান আল্লাহর সামনে উচ্চারণ করি, সেগুলোর অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে সচেতনভাবে ভাবা এবং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করাও জরুরি।
এই ভাবনা থেকেই তাঁর বাংলা বই 'সূরা আল-ফাতিহা: সাতটি আয়াত যা আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবন বদলে দিয়েছে'। বইটিতে লেখক কেবল সূরাটির অর্থ তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং এর শিক্ষা কীভাবে ব্যক্তিগত জীবন, মানসিকতা, সিদ্ধান্ত এবং আত্মসমালোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, সে বিষয়ে নিজের উপলব্ধি পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রতিদিন যে অঙ্গীকার করি, আমাদের দৈনন্দিন জীবন কি সেই অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
ড. সালেহীনের পেশাগত জীবনও দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের মীনা বাজার, এলজি বাটারফ্লাই, আকিজ ও পারটেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানে সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের পর তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে নিজের কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ মেরিটাইম একাডেমিতে হেড অব মেরিটাইম লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি এমএসসি ইন মেরিটাইম অপারেশনস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের একাডেমিক প্রোগ্রাম চেয়ার। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস থেকেও তাঁর সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টবিষয়ক বই প্রকাশিত হয়েছে।
:
কর্পোরেট নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, গবেষণা ও শিক্ষাঙ্গনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁর উপলব্ধি আরও গভীর হয়েছে যে, মানুষের সফলতাকে শুধু পেশাগত পদ, আর্থিক অর্জন কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে পুরোপুরি বিচার করা যায় না। একজন মানুষ কতটা সৎ, দায়িত্বশীল ও কৃতজ্ঞ, কীভাবে অন্যদের সঙ্গে আচরণ করেন এবং নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে জীবনে কতটা ধারণ করেন, সেগুলোও তাঁর জীবনকে মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সূরা আল-ফাতিহার শিক্ষা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনা ও জীবনকে নতুনভাবে দেখার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
সূরা আল-ফাতিহায় আমরা মহান আল্লাহর প্রশংসা করি, তাঁর দয়া ও রহমতের কথা স্মরণ করি, বিচার দিবসের কথা স্বীকার করি এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত ও সাহায্য প্রার্থনার অঙ্গীকার করি। এরপর আমরা সঠিক পথের দিশা চাই। ড. সালেহীনের আলোচনার তাৎপর্য হলো, এই প্রার্থনাগুলোকে কেবল মুখে উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেদের চিন্তা, আচরণ ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা। আমরা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি? সংকটে ধৈর্য ধারণ করি? অন্যের প্রতি ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিই? সঠিক পথের জন্য প্রার্থনা করার পাশাপাশি সেই পথে চলার চেষ্টা করি? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াই তাঁর বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনেও এই আত্মজিজ্ঞাসার বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। উন্নত জীবন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পেশাগত প্রতিষ্ঠা এবং সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অনেক পরিবারকে প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। জীবিকার দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের চাপ, পরিবারের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে নিজেদের জন্য সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এই ব্যস্ততার মধ্যে মানসিক প্রশান্তি, পারিবারিক সম্পর্ক, আত্মিক উন্নতি এবং জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ কতটা থাকে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
সন্তানদের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো, প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের আর্থিকভাবে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা অভিভাবকদের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের সৎ, বিনয়ী, কৃতজ্ঞ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে সূরা আল-ফাতিহা মুখস্থ করানোর পাশাপাশি এর অর্থ ও তাৎপর্য বোঝার সুযোগ করে দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে এর শিক্ষা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা পরিবারে মূল্যবোধ চর্চার একটি অংশ হতে পারে। ড. সালেহীনের বইয়ের ভাবনা পাঠকদের এমন বিষয় নিয়েও নতুন করে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ একই বছরের আগস্টে প্রকাশিত হয়েছে বলে লেখকের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। বইটিতে ড. সালেহীন নিজেকে ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা, আত্মসমালোচনা এবং উপলব্ধির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর এই অবস্থান বইটির আলোচনাকে ব্যক্তিগত ও চিন্তামূলক পরিসরে রাখে। পাঠকের কাছে তাঁর আহ্বান হলো, নিজের বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে দেখা এবং পরিচিত ধর্মীয় অনুশীলনগুলোর তাৎপর্য আরও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা।
জীবনে দুশ্চিন্তা, ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তা থাকবেই। ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আত্মসমালোচনা অনেক মানুষের জন্য আশা, ধৈর্য এবং মানসিক শক্তির উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সূরা আল-ফাতিহার শিক্ষা মানুষকে কৃতজ্ঞতা, দায়িত্ববোধ, সঠিক পথের সন্ধান এবং মহান আল্লাহর ওপর আস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। এই শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনযাপনে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার মধ্যেই বইটির মূল আবেদন নিহিত।
আমরা জীবনে অনেক কিছু হতে চাই-ধনী, প্রতিষ্ঠিত, ক্ষমতাবান ও সফল। কিন্তু এসব আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি নিজেদের কাছে আরেকটি প্রশ্ন রাখা জরুরি: আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি? আমাদের অর্জন কি আমাদের আরও কৃতজ্ঞ, বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করছে? আমরা কি নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবন পরিচালনার চেষ্টা করছি? আর প্রতিদিন মহান আল্লাহর কাছে সঠিক পথের দিশা চাওয়ার পর সেই পথে চলার জন্য কী পদক্ষেপ নিচ্ছি?
ড. ফেরদৌস সালেহীনের 'সূরা আল-ফাতিহা: সাতটি আয়াত যা আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবন বদলে দিয়েছে' বইটি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাঠকের হয়ে নির্ধারণ করে দেয় না; বরং নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর একটি সুযোগ তৈরি করে। সূরা আল-ফাতিহার সাতটি আয়াত প্রতিদিন পাঠ করার পাশাপাশি সেগুলোর অর্থ, তাৎপর্য ও জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা নিয়ে সচেতনভাবে ভাবার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, সেটিই বইটির মূল বক্তব্য।
জীবনের সাফল্য শুধু আমরা কতটুকু অর্জন করেছি, তার হিসাব নয়। আমরা কেন বেঁচে আছি, কোন পথে চলছি, আমাদের অর্জন কীভাবে অন্যদের জীবনে প্রভাব ফেলছে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছাতে চাই-এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সূরা আল-ফাতিহাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে ড. সালেহীনের বইটি পাঠককে সেই আত্মজিজ্ঞাসার দিকে আহ্বান জানায়।
