কোরিয়ার মানুষ তখন কে-পপ, কে-ড্রামায় মজে আছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অন্য এক খোঁজ শুরু হয়েছে। ইসলাম কী? কোরআনে কী আছে? প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই। কারণ উত্তরটা যে ভাষায় আছে, সেটা তারা বোঝে না।
সেই শূন্যতাটা দেখেছিলেন একজন। তিনি ঠিক করলেন, উত্তরটা মানুষের মাতৃভাষাতেই পৌঁছে দেবেন। আর সেই একটা লক্ষ্যের পেছনেই তিনি দিয়ে দিলেন জীবনের ৭টি বছর।
তিনি ড. হামিদ চোই ইয়ং-কিল। দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম পণ্ডিত, যিনি পবিত্র কোরআন ও সহিহ আল-বুখারির অর্থ সরাসরি আরবি থেকে কোরীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
১৯৪৯ সালের ২৪ এপ্রিল দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্ম। জন্ম নাম চোই ইয়ং-গিল। পড়াশোনার শুরু সিউলেই। ১৯৭৫ সালে হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক শেষ করেন।
আরবি ভাষার প্রেমই তাঁকে টেনে নিয়ে যায় সৌদি আরবের মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা শেষে সুদানের ওমদুরমান ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে পিএইচডি করেন ইসলামিক স্টাডিজে।
দেশে ফিরে তিনি যোগ দেন মিয়ংজি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে। আজ তিনি শুধু অধ্যাপক নন, কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশনের চেয়ারপারসন, কোরিয়ান ইসলামিক হিবা ফান্ডের চেয়ারম্যান। কোরিয়ায় ইসলামের প্রতিনিধিত্ব মানেই তাঁর নাম।
কাজটা সহজ ছিল না। আরবি একটি আয়াতের ভাব, গভীরতা, আবেগ - সবটুকু কোরীয় ভাষায় তুলে আনা। একটা ভুল শব্দ পুরো অর্থ বদলে দিতে পারে।
তাই তিনি তাড়াহুড়ো করেননি। প্রায় ৭ বছর ধরে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একাই কাজ করে গেছেন।
১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর কালজয়ী কাজ। এর নির্ভুলতা এতটাই নিখুঁত ছিল যে সৌদি আরবের কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স ফর দ্য প্রিন্টিং অব দ্য হোলি কোরআন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা ও অনুমোদন দেয়।
এখানেই থামেননি তিনি। পরে অনুবাদ করেন সহিহ আল-বুখারিও। ফলে তিনিই হলেন ইতিহাসের প্রথম কোরীয় মুসলিম, যিনি এই দুটি প্রধান গ্রন্থই নিজের মাতৃভাষায় অনুবাদ করেছেন। তাঁর লেখা ও অনুবাদ করা ইসলামি বইয়ের সংখ্যা ৯০টিরও বেশি।
তাঁর এই নীরব কাজ একসময় বিশ্বের নজর কাড়ে। ২০০৮ সালে পান কিং আবদুল্লাহ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর ট্রান্সলেশন। ২০১৪ সালে কোরিয়া সরকার দেয় শিক্ষা পদক।
আর ২০২৩ সালে আসে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান। ইসলামের সেবায় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার - কিং ফয়সাল প্রাইজ। তিনিই প্রথম কোরীয় নাগরিক যিনি এই পুরস্কার পান। পুরস্কার কমিটি লিখেছিল, তাঁর অনুবাদ "গুণমান, নির্ভুলতা ও স্পষ্টতায় অনন্য, যা কোরীয়-ভাষী মানুষের কাছে ইসলামি সংস্কৃতিকে পৌঁছে দিয়েছে।"
আজ সিউলের মসজিদে যখন কোনো নতুন কোরীয় মুসলিম তাঁর নিজের ভাষায় কোরআন পড়ে কাঁদেন, সেই চোখের পানিতে মিশে থাকে ড. হামিদ চোই ইয়ং-কিলের ৭ বছরের নীরব সাধনা। তিনি প্রমাণ করেছেন, আলো পৌঁছে দিতে প্রদীপ নয়, একজন মানুষের ইচ্ছাই যথেষ্ট।
