দেশে সরাসরি ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বাংলা কিউআরকে আরও কার্যকর করতে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলা কিউআর ব্যবহার করে ক্রেতা দোকানে পণ্য কিনে সরাসরি মার্চেন্টের অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন। এতে নগদ টাকা ব্যবহারের প্রয়োজন কমে এবং পরবর্তী সময়ে সেই টাকা ক্যাশ আউট করার প্রয়োজনও থাকে না। তবে বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট দোকানদারকে বিভিন্নভাবে বাংলা কিউআর ব্যবহার না করতে হুমকি দিচ্ছে বিকাশের কর্মীরা। শুধু তাই নয় বিকাশের এজেন্ট পর্যায়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
দোকানদারের অভিযোগ, এজেন্ট কর্মীদের পক্ষ থেকে নতুন বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য দৈনিক টার্গেট দেওয়া হয়। টার্গেট না দিলেই মিলে নানা ধরনের হুমকি।
Ad mobile
রাজধানীর মিরপুর এলাকার বিকাশ এজেন্ট কামাল মিয়া ক্যাম্পাস টাইমসকে বলেন, "বিকাশের এক কর্মী সরাসরি বলে গিয়েছেন বাংলা কিউআর দোকানে রাখলে বিকাশ চালাতে পারবো না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে বাংলা কিউআর দোকানে রাখছি না।"
আগারগাঁও এলাকার আরেক দোকানদার শাহীন আলম জানান, "বাংলা কিউআর তো ব্যবহার করা যাবেই না সঙ্গে আবার দৈনিক নতুন নতুন বিকাশ একাউন্ট খোলার টার্গেট দিয়ে যাচ্ছে বিকাশের কর্মীরা।"
বিকাশ গ্রাহক সুদেব দাস বলেন, "ক্যাশ আউট করলে আমাদের কাছ থেকেই চার্জ নেওয়া হয়। আবার বাংলা কিউআর দিয়ে সরাসরি পেমেন্ট করতে গেলেও যদি বাধা আসে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?"
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস-এম/এফ/এসের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ ও কেনাকাটা এখন মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের অংশ। তবে প্রয়োজনের সময় নিজের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা নগদে তুলতে গেলেই দিতে হচ্ছে নির্দিষ্ট হারে ক্যাশ আউট চার্জ। এ নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—ডিজিটাল আর্থিক সেবা সাধারণ মানুষের জন্য কতটা কম খরচের হচ্ছে।
বিকাশের সাধারণ এজেন্ট পয়েন্ট থেকে ক্যাশ আউট করলে প্রতি হাজার টাকায় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা চার্জ দিতে হয়। সে হিসাবে ১০ হাজার টাকা তুলতে খরচ হয় ১৮৫ টাকা। আর ৫০ হাজার টাকা তুললে ক্যাশ আউট চার্জ দাঁড়ায় ৯২৫ টাকা। প্রিয় নম্বরে ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে এই খরচ কিছুটা কম।
গ্রাহকদের অভিযোগ, মাসের পর মাস অল্প অল্প করে অ্যাকাউন্টে টাকা জমিয়ে প্রয়োজনের সময় নগদে তুলতে গেলে এসব চার্জের পরিমাণ বছরে বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সহজ করলেও নগদ টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে কি না।
বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে তাদের নিবন্ধিত ও ভেরিফায়েড গ্রাহক ছিল প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে ওই বছরের শেষ তিন মাসে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহক লেনদেন করেন। দেশজুড়ে বিকাশের এজেন্ট পয়েন্ট ছিল ৩ লাখ ৫ হাজারের বেশি এবং মার্চেন্ট পেমেন্ট আউটলেট প্রায় ১০ লাখ।
বড় গ্রাহক ও এজেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাড়ছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার পরিমাণও। ২০২৫ সালে বিকাশের আয় প্রায় ৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা এবং নেট আয় প্রায় ৬৬১ কোটি টাকা বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য থেকে জানা যায়। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির প্রফিট ছিল প্রায় ৩১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রতিষ্ঠানটির আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্যাশ আউট চার্জের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন গ্রাহকরা। রাজধানীতে বিকাশ গ্রাহক ফারদিন ইসলাম ক্যাম্পাস টাইমসকে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং এর মধ্যে বিকাশেই ক্যাশ আউটে চার্জ বেশি নেয়া হয়। এখন বিকাশ সব জায়গায় পাওয়া যায় তাই বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
আরফিন আরা নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস টাইমসকে বলেন, "বিকাশে টাকা রাখা সহজ, কিন্তু ক্যাশ আউট করতে গেলেই অনেক বেশি চার্জ দিতে হয়।নিজের টাকা তুলতেই যদি এতো টাকা কেটে নেয়,তাহলে এটা আমাদের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়ায়।"
এদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সব ধরনের লেনদেন বিনামূল্যে নয়। ভারতে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং মার্চেন্ট পেমেন্টে ডিজিটাল লেনদেনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সরাসরি ডিজিটাল পেমেন্ট করা সম্ভব হওয়ায় নগদ টাকা উত্তোলনের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
পাকিস্তানেও কিছু আর্থিক লেনদেনে নির্দিষ্ট চার্জ রয়েছে। নেপালের ই-সেবা প্ল্যাটফর্মেও ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চার্জ কাঠামো রয়েছে। তবে ছোট অঙ্কের ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কম রাখার বিষয়টি এসব দেশে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু বিপুলসংখ্যক মানুষকে একটি ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার পর গ্রাহক কতটা সহজ ও কম খরচে নিজের অর্থ ব্যবহার করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এসব নিয়ে বিকাশের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা শামসুদ্দিন হায়দার ডালিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে ইনিস্টিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট মহাপরিচালক ড.মোঃ এজাজুল ইসলাম ক্যাম্পাস টাইমসকে বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব মানুষরা ব্যাংক সহজে ব্যবহার করতে পারে না। আর এটার সুযোগ নিয়ে বিকাশ তাঁদের মনোপলি বিজনেস চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিকাশের উচিত তাদের এই চার্জের পরিমাণ কমিয়ে আনা।
